মোঃ মাইন উদ্দিন :
সত্য ও মিথ্যার লড়াই মানবসভ্যতার ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। যুগে যুগে যেমন সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ সংগ্রাম করেছে, আবার মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টাও করেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের ফলে মিথ্যা এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি উদ্বেগজনক। বর্তমানে একটি মিথ্যা, বিকৃত তথ্য, মনগড়া গল্প কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা কয়েক মিনিটে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে সত্য যাচাইয়ের আগেই মিথ্যাই মানুষের বিশ্বাসে স্থান করে নিচ্ছে। মিথ্যা শুধু কোনো ব্যক্তি বা কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং রাষ্ট্র, সমাজ, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় হুমকি।
আজ সমাজের নানা স্তরে মিথ্যার এমন প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেকে সত্যকে আড়াল করে নিজেদের সুবিধামতো একটি মিথ্যাকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। কখনো ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে, কখনো ব্যক্তিকে মিথ্যায় উপস্থাপন করে ছোট করা হচ্ছে, আবার কখনো সম্পূর্ণ মনগড়া তথ্যকে সত্য হিসেবে প্রচার করছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব মিথ্যা অনেক সময় এত পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হয় যে সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
মিথ্যার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, মিথ্যা মানুষের বিশ্বাসকে ধ্বংস করে। মনে রাখতে হবে একটি জাতি তখনই শক্তিশালী থাকে, যখন সত্যের ওপর আস্থা রাখতে পারে। কিন্তু যখন প্রতিনিয়ত বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায় তখন মানুষের মধ্যে সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং বিভক্তি তৈরি হয়। পরে একসময় মানুষ প্রকৃত সত্যকেও সন্দেহ করতে শুরু করে। এর ফলে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যায় এবং নৈতিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়ে।
ইতিহাস বিকৃতি মিথ্যার সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপগুলোর একটি। একটি জাতির ইতিহাস শুধু অতীতের ঘটনাপঞ্জি নয়, ইতিহাস একটি জাতির আত্মপরিচয়, চেতনা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। যদি পরিকল্পিতভাবে ইতিহাস পরিবর্তন করা হয় কিংবা অসত্য তথ্যকে ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভুল শিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠবে। তারা প্রকৃত ঘটনা, প্রকৃত সংগ্রাম এবং প্রকৃত অবদান সম্পর্কে বিভ্রান্ত হবে। তখন একটি জাতির জন্য এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর হতে পারে না।
শুধু ইতিহাস নয়, সামাজিক জীবনেও মিথ্যার ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে। গুজবের কারণে নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে, পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে, সামাজিক বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে এবং কখনো কখনো প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। অসত্য তথ্য মানুষের আবেগকে উসকে দেয়, উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও বাড়িয়ে দেয়।
অর্থাৎ একটি মিথ্যা কখনো শুধু একটি বাক্য বা একটি পোস্টে সীমাবদ্ধ থাকে না, এর প্রভাব বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
অনেকে যুক্তি দেন, মিথ্যার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতাই যথেষ্ট। হ্যাঁ সচেতনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা সবসময় যথেষ্ট নয়। কারণ ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানো, ইতিহাস বিকৃত করা কিংবা অসত্য তথ্য প্রচার অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পিত অপরাধে পরিণত হয়েছে। ফলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে উপযুক্ত আইনি কাঠামো এবং কার্যকর প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইন এমন হতে হবে, যা ইচ্ছাকৃত মিথ্যা প্রচার, প্রতারণামূলক তথ্য পরিবেশন এবং সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে, কিন্তু একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, যুক্তিসংগত সমালোচনা, গবেষণা এবং সত্যভিত্তিক মতামত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সত্য বলার অধিকার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি মিথ্যা ছড়ানোর অপচেষ্টাকেও কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই শুধু রাষ্ট্রের একার দায়িত্ব নয়।
পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠনসহ প্রতিটি নাগরিকেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সত্যবাদিতার শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় তথ্য যাচাই, যুক্তিবোধ এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। পরিবারে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সত্য বলাকে উৎসাহিত করা হবে এবং মিথ্যাকে কখনো প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাতেও সত্যের গুরুত্ব সর্বোচ্চ। পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মই সত্যবাদিতাকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হিসেবে বিবেচনা করেছে এবং মিথ্যাকে গুরুতর অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ মিথ্যা শুধু একজন ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, এটি পুরো সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে যে, সাময়িকভাবে মিথ্যা হয়তো সফল মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সত্যই বিজয়ী হয়। ইতিহাসে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে বছরের পর বছর প্রচারিত মিথ্যা একসময় ভেঙে পড়েছে এবং সত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সেই সময় পর্যন্ত ব্যক্তি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রকে যে মূল্য দিতে হয়, তা কখনোই ছোট নয়। তাই মিথ্যা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই তাকে প্রতিরোধ করাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
আমরা পৃথিবীতে চিরদিনের জন্য আসিনি। একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে। কিন্তু আমাদের রেখে যাওয়া কাজ, মূল্যবোধ এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের পরিচয় বহন করবে। যদি আমরা জেনেশুনে সত্যকে আড়াল করে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করি কিংবা অসত্যকে প্রশ্রয় দিই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের দায়িত্বহীনতা ও নৈতিক ব্যর্থতার জন্য কঠোরভাবে বিচার করবে। তারা প্রশ্ন তুলবে- কেন আমরা সত্য জানার পরও মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত হতে দিয়েছিলাম?
অতএব, মিথ্যার আগ্রাসন রোধে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন সময়োপযোগী ও ন্যায়সঙ্গত আইন, কার্যকর প্রয়োগ, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি, নৈতিক শিক্ষা এবং সর্বোপরি সত্যের প্রতি সামাজিক অঙ্গীকার। সত্যকে আড়াল করে কোনো জাতি কখনো টেকসই উন্নতি করতে পারে না। একটি ন্যায়ভিত্তিক, সভ্য ও মূল্যবোধসম্পন্ন রাষ্ট্র গড়তে হলে সত্যকে মর্যাদা দিতে হবে এবং ইচ্ছাকৃত মিথ্যা ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। কারণ সত্যের ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে আস্থা, আর আস্থার ভিত্তিতেই টিকে থাকে একটি জাতির ভবিষ্যৎ।