জ্বালানি ও বিদ্যুৎ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো থেকে আর্থিক সেবা—বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করতে ঢাকায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি শীর্ষস্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ৪৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। সফরকালে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে বৈঠক করে সম্ভাবনাময় খাত, বিনিয়োগের সুযোগ এবং দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা নেবেন তাঁরা।
আজকের পত্রিকা এক প্রতিবেদনে জানায়, এখন পর্যন্ত প্রতিনিধি দলের কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট বিনিয়োগের অঙ্ক বা প্রকল্প ঘোষণা করেনি। ফলে সফরটিকে সরাসরি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাংলাদেশে কোথায় এবং কীভাবে বিনিয়োগ করা যায়—তার প্রাথমিক অনুসন্ধান হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। অবশ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সফর শেষে ঢাকা ছাড়ার আগে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিনিধি দলের সদস্যরা গত রোববার ও সোমবার ঢাকায় পৌঁছান।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা। এরপর সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করবেন তারা।
বৈঠকগুলোতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, অফশোর তেল-গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ও হাইটেক পার্ক, ফিনটেক, ব্যাংক-বিমা, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্প, লজিস্টিকস ও সেবা খাত গুরুত্ব পাবে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের একটি দল বাংলাদেশে এসেছে।
তাঁদের দেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কে জানানো হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, মার্কিন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সফর বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ।
প্রতিনিধি দলের আগ্রহের তালিকায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় বিনিয়োগের সুযোগ খতিয়ে দেখবেন মার্কিন ব্যবসায়ীরা।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বঙ্গোপসাগরের অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে।
সরকার সম্প্রতি ২৬টি অফশোর ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে ব্রেন্টের দামের সঙ্গে সংযোগ, মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ এবং কর-সুবিধাসহ বিভিন্ন প্রণোদনা রাখা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে যুক্ত মার্কিন জ্বালানি কম্পানিগুলোর জন্য অফশোর অনুসন্ধান নতুন বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালনের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি অবকাঠামোতেও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বাড়তি চাহিদা মেটাতে এসব খাতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের মতো অনেক খাত রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তায় বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ আছে। একই সঙ্গে যেসব খাতে তুলনামূলক কম জ্বালানি প্রয়োজন, সেগুলোকেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা উচিত।
জ্বালানির পর মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য বিনিয়োগের অন্যতম বড় ক্ষেত্র হতে পারে তথ্যপ্রযুক্তি। হাইটেক পার্ক, সফটওয়্যার, ডেটা সেন্টার, ডিজিটাল অবকাঠামো ও ই-কমার্সে বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল লেনদেন, ডেটা প্রসেসিং এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার কারণে এই খাতে বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও রয়েছে।
ফিনটেক খাতেও তৈরি হয়েছে নতুন সুযোগ। ডিজিটাল পেমেন্ট, পেমেন্ট গেটওয়ে, আর্থিক প্রযুক্তি এবং ডেটাভিত্তিক সেবার সম্প্রসারণ মার্কিন প্রযুক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন বাজার তৈরি করতে পারে।
অবকাঠামো খাতেও রয়েছে বড় সম্ভাবনা। সমুদ্রবন্দর, অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস, পরিবহন সংযোগ, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প পার্কে মার্কিন বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ খোঁজা হচ্ছে। বন্দর ও কাস্টমসের কার্যকারিতা বাড়ানো, দ্রুত পণ্য খালাস এবং সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগের উপস্থিতি অবশ্য নতুন নয়। সিটিব্যাংক ও মেটলাইফসহ বেশ কয়েকটি বড় মার্কিন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এ দেশে ব্যবসা করছে। ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক সেবায় প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বিনিয়োগেরও সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে মার্কিন পুঞ্জীভূত বিনিয়োগ ইতিমধ্যে ৪০০ কোটি ডলারের বেশি। তবে এর বড় অংশ এসেছে বাংলাদেশে আগে থেকেই কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগ থেকে। ফলে নতুন মার্কিন বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২৫টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সফরকে শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না। কোন খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজন, কী ধরনের প্রকল্প নেওয়া দরকার এবং বিনিয়োগকারীদের কী ধরনের সুবিধা দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে বাংলাদেশকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ এলে কোন কোন খাতে তা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোয় মার্কিন বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘বিদেশি ব্যবসায়ীরা এলেই হবে না। তাঁদের জন্য সুস্পষ্ট নীতি, নীতির ধারাবাহিকতা ও প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।’
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, মার্কিন বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হবে। তবে বিনিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
তার মতে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশার তুলনায় কম। তাই মার্কিন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের এই সফরকে কোন খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজন, কত বড় প্রকল্প দরকার এবং বিনিয়োগকারীদের কী ধরনের সুবিধা দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তৈরির সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো উচিত।