মোঃ মাইন উদ্দিন :
বর্ষা এলেই কিশোরগঞ্জের হাওর যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। অথৈ জলরাশি, দিগন্তজোড়া সবুজ প্রকৃতি, বিস্তীর্ণ জলাভূমি এবং নৌভ্রমণের অনন্য অভিজ্ঞতা প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাজারো পর্যটককে আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রামের হাওরাঞ্চল বর্ষা মৌসুমে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়। এই পর্যটন কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নৌযান ব্যবসা, আবাসন ও সেবাখাতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চল সাম্প্রতিক সময়ে নৌ-ডাকাতির ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন ও করিমগঞ্জ সীমান্তবর্তী হাওরে সংঘটিত দুটি নৌ-ডাকাতির ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতাই প্রকাশ করেনি, বরং পর্যটন নিরাপত্তা এবং মানুষের আস্থার ভিত্তিকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
প্রথম ঘটনায় হাওর ভ্রমণ শেষে প্রায় ৪০ জন পর্যটক বহনকারী একটি ট্রলারে সশস্ত্র ডাকাত দল হামলা চালায়। যাত্রীদের জিম্মি করে মারধর করা হয় এবং তাদের নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায়। একটি আনন্দময় ভ্রমণ মুহূর্তেই রূপ নেয় ভয়, আতঙ্ক ও অসহায়ত্বের অভিজ্ঞতায়।
তারপর ঘটে আরও মর্মান্তিক একটি ঘটনা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া মাত্র ১৫ দিন বয়সী এক নবজাতকের মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন স্বজনরা। শোকাহত সেই পরিবারের নৌকাও ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন, এমনকি নৌকার সোলার প্যানেলের ব্যাটারিও লুট করা হয়। এটি শুধু একটি অপরাধ নয়, মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের প্রতীক। এমন ঘটনা সমাজে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ায় এবং হাওরভিত্তিক পর্যটনের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
পর্যটন শিল্পের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো নিরাপত্তা ও আস্থা। কোনো পর্যটনকেন্দ্র সম্পর্কে একবার অনিরাপত্তার ধারণা তৈরি হলে তা দূর করতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে। ফলে ক্ষতির মুখে পড়েন শুধু পর্যটক নন, নৌকার মাঝি, স্থানীয় গাইড, হোটেল-রিসোর্ট মালিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং পর্যটননির্ভর অসংখ্য পরিবারও এর নেতিবাচক প্রভাব বহন করেন। অর্থাৎ একটি অপরাধের অভিঘাত ব্যক্তি বা পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নৌ-পুলিশের টহল জোরদার, বিশেষ অভিযান পরিচালনা, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কন্ট্রোল রুম স্থাপন এবং সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে হাওরে চলাচল সীমিত করার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে প্রশ্ন থেকে যায়- অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও স্থায়ী করা যাচ্ছে না কেন?
হাওরের মতো বিস্তীর্ণ জলাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রচলিত ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পনা। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সার্বক্ষণিক দ্রুতগতির নৌ-পেট্রোলিং, স্থায়ী জল-পুলিশ ফাঁড়ি, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, গোয়েন্দা নজরদারি, জরুরি সহায়তার হটলাইন এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে কমিউনিটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে নৌ-ডাকাতির ঘটনার দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধের বিচারহীনতা নতুন অপরাধকে উৎসাহিত করে- এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিশোরগঞ্জের হাওর কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, জীববৈচিত্র্য এবং গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সম্পদকে নিরাপদ রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব বাস্তবায়নে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় জনগণ, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী এবং নাগরিক সমাজ- সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ নিরাপত্তাহীন পরিবেশে টেকসই পর্যটন কখনোই বিকশিত হতে পারে না।
বর্ষার হাওর মানুষের কাছে সৌন্দর্য, স্বস্তি ও নির্মল আনন্দের প্রতীক। সেই সৌন্দর্য যেন আতঙ্কের প্রতীকে পরিণত না হয়। সময়োপযোগী পরিকল্পনা, কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অপরাধের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির বাস্তব প্রয়োগই পারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। নিরাপদ, নৌ-ডাকাতিমুক্ত ও সুশৃঙ্খল হাওর গড়ে তুলতে পারলেই কিশোরগঞ্জ শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রেও একটি সম্ভাবনাময় ও বিশ্বস্ত গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে।