ক্যালেন্ডারের পাতায় ১৭ আগস্ট এলে বাংলা কবিতাপ্রেমীদের মনে ফিরে আসে একটি নাম, শামসুর রাহমান। ২০০৬ সালের এই দিনে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। পরে তাঁর ইচ্ছানুযায়ী বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। সেই হিসাবে আধুনিক বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবির শামসুর রাহমানের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
বাংলা কবিতায় শামসুর রাহমান শুধু একজন কবির নাম নয়; তিনি একটি সময়ের প্রতীক। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর কবিতায় শক্তিশালীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি কবিতাকে শুধু নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং গণতান্ত্রিক চেতনাকে কবিতার মাধ্যমে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। তাঁর রচনায় ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি জাতির সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং প্রত্যাশাও সমান গুরুত্ব পেয়েছে।
১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলিতে জন্মগ্রহণ করেন শামসুর রাহমান। পঞ্চাশের দশকে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। এরপর তিনি ষাটটিরও বেশি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন।
কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ, উপন্যাস, অনুবাদ এবং সাংবাদিকতায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন শামসুর রাহমান। তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলোর মধ্যে ‘আসাদের শার্ট’, ‘স্বাধীনতা তুমি’ এবং ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব কবিতা আজও বাঙালির সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শামসুর রহমানের লেখা কবিতাগুলো পরবর্তীকালে ‘বন্দী শিবির থেকে’ গ্রন্থে সংকলিত হয়। বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাব্যচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে গ্রন্থটি বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ দেশি-বিদেশি বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তবে পুরস্কারের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার।
শামসুর রাহমান সেই বিরল কবিদের একজন, তাঁর কবিতা এখনও বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীনতার আলো জ্বালিয়ে রাখে। তাই তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী শুধু একজন কবিকে স্মরণ করার দিন নয়; এটি বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাকে নতুন করে উপলব্ধি করারও একটি উপলক্ষ।