বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৫ পূর্বাহ্ন

ক্ষুধার দায়ে অপরাধ, শাস্তির দায় কার?

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬
  • ৬৮ Time View
89

মোঃ মাইন উদ্দিন :

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এমন কিছু ভিডিও এবং খবর চোখে পড়ে, যা আমাদের সমাজ তথা রাষ্ট্রের মানবিক অবস্থান নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। যেমন: একদিকে চুরির মত অপরাধ কিংবা ক্ষুদ্র অপরাধে শিশুদের অমানবিক নির্যাতন, অন্যদিকে শিশু ধর্ষণ ও বলৎকার। এসব সংবাদ স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন করে তুলে। তবে উদ্বেগের কারণ শুধু অপরাধ নয়, বরং অপরাধের প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়াও

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেদিন এক শিশুকে নির্যাতনের ভিডিও দেখে অন্তত ১৩/১৪ বছর আগের একটি ঘটনা মনে পড়লো। আমার এক ভাগিনা, যার বয়স ছিল তখন পাঁচ বছর। সে পাশের বাড়ির গাছ থেকে কয়েকটি কাঁচা লটকন পেড়ে এনেছিল। বিষয়টি জানার পর আমি তাকে মারধর করিনি, অপমানও করিনি। বরং আদর সোহাগ করে বুঝিয়ে বলেছিলাম, অন্যের জিনিস অনুমতি ছাড়া নিয়ে আসা ঠিক নয়। বলেছিলাম, ভবিষ্যতে এমন কাজ করলে আমি কিন্তু তোমাকে কোনোদিন জামা- কাপড়, খেলনা কিংবা মজা কিনে দেব না। সেদিন ভাগিনার শিশুমনে কথাটি গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল। আজ সে বড় হয়েছে, সংসার পরিচালনা করছে, কিন্তু ছোটবেলার সেই শিক্ষার কথা এখনও সে মনে রেখেছে।

আমি প্রায়ই ভাবি, সেদিন যদি তারে ‘চোর’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে অপদস্থ করতাম, বা মারধর করতাম, তাহলে কি তার চরিত্র গঠনে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখত? নাকি ওর মনে ক্ষোভ, ভয় ও অপমানের বীজ বপন করত?

জানিনা এই ভিডিও’র ঘটনাটি কোথায়, বা কবে ধারণ করা হয়েছে, তবে ভিডিওতে দেখা যায়, শিশুটির ওপর অমানবিক ও নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। আশপাশে বিস্কুট, রুটি এবং চিপসের মতো খাদ্যসামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। ধারণা করা যায়, শিশুটি হয়তো কোনো দোকান থেকে এগুলো নিয়ে এসেছিল। যদি এটিই সত্য হয়, তাহলে সে অবশ্যই ভুল করেছে। যাকে বলা হয় শিশু অপরাধ। কিন্তু সেই ভুলের প্রতিকার কি এমন পিটুনি?

সত্যিকার অর্থে একটি শিশু অপরাধ করলে সেই অপরাধকে শিশু অপরাধ হিসেবেই দেখা উচিত, এবং তার বিচারও হতে হবে শিশু আইন ও শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থের নীতিমালা অনুসরণ করে। কারণ শিশুর অপরাধের পেছনে প্রায়ই থাকে দারিদ্র্য, অবহেলা, পারিবারিক সংকট কিংবা সামাজিক বঞ্চনা। এসব কারণ বিবেচনায় না নিয়ে কেবল শাস্তি প্রয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না, বরং নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয়।
আমরা যদি উন্নত বিশ্বের দিকে তাকায় তখন দেখতে পাই অনেক দেশে কোনো শিশু চুরি বা চুরির মতো অনুরূপ অপরাধে জড়ালে শিশুটিকে নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। জানতে চাওয়া হয়- কেন শিশুটি এই অবস্থায় পৌঁছাল? কেন সে চুরি করল? তার মৌলিক চাহিদা পূরণে কোথায় ঘাটতি ছিল? এমনকি সংশ্লিষ্ট সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো কি করছিল?

আমাদের দেশেও এই প্রশ্নগুলো করা প্রয়োজন। কারণ অভাব-অনটনের তাড়নায়, ক্ষুধার চাপে কিংবা বঞ্চনার কারণে যারা ছোটখাটো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তাদের অনেকেই প্রকৃত অর্থে অভাব-অনটনে জর্জরিত এবং সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষ। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সমাজে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার দুর্বলরাই।
রাষ্ট্রের অপরাধ দমন অবশ্যই জরুরি। কিন্তু ন্যায়বিচার আর মানবিকতা বিসর্জন দিয়ে অপরাধ দমন করা যায় না। শিশু যদি ভুল পথে হাঁটে, তবে তাকে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। তাকে অপরাধী বলে নয়, শিশু- অপরাধী হিসেবে দেখতে হবে। কারণ প্রতিটি শিশুর সামনে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সভ্য সমাজের পরিচয় অপরাধীকে কতটা কঠোর শাস্তি দিল তাতে নয়, বরং ভুল করা মানুষকে কতটা ন্যায়সঙ্গত ও মানবিক উপায়ে সংশোধনের সুযোগ দিল, তাতেই নিহিত।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © jago barta
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com