বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৩ অপরাহ্ন

প্রতিশ্রুতি রক্ষায় নবীজি (সা.)-এর আদর্শ

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২৩ Time View
33

অঙ্গীকার রক্ষা করা ভালো মানুষের প্রমাণ। জগতের সবচেয়ে ভালো মানুষ তথা নবী-রাসুলরা সর্বদা ওয়াদা রক্ষা করতেন। এজন্যই পবিত্র কোরআনে মুমিনদের বিশেষ গুণাবলি উল্লেখ করতে গিয়ে ‘ওয়াদা পূর্ণকারী’ গুণটিও উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তারা যখন ওয়াদা করে, তা তারা পূর্ণ করে থাকে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৭৭)

ওয়াদা রক্ষা করা আল্লাহ তাআলারও বিশেষ গুণ। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ওয়াদা ভঙ্গ করেন না।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৯)

ওয়াদা রক্ষার ব্যাপারে বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) বিরল নজির স্থাপন করে গিয়েছেন। তাঁর চিরশত্রুরা পর্যন্ত তাঁকে ওয়াদার ব্যাপারে নিরাপদ মনে করত। নবুয়তের আগে তাকে আল আমিন বলে ডাকত। তার এক মহাশত্রু আবু সুফিয়ানের জবানবন্দি এর সাক্ষী। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যখন রোমের বাদশাহ হিরাক্লিয়াস মহানবী (সা.) সম্পর্কে আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে ‘এ নবী কি ওয়াদা ভঙ্গ করেন?’ তখন আবু সুফিয়ান বলেছিল, ‘না’। (বুখারি, হাদিস : ৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিশ্রুতি রক্ষার কয়েকটি নজির

১. বদরের যুদ্ধের ঘটনা। সে সময় লোকবল ও উপকরণ সকল দিক থেকে মুসলমানদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। হুজাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.) বলেন, আমি ও আমার পিতা বদরের যুদ্ধে এজন্য অংশগ্রহণ করতে পারিনি যে আমরা মদিনার উদ্দেশে রওনা হলে কুরাইশের কাফেররা আমাদের গ্রেফতার করে এবং এই ওয়াদা নেয় যে আমরা মদিনায় যেতে পারি, তবে মুহাম্মাদ (সা.)-এর সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করব না। আমরা মদিনায় রাসুল (সা.)-এর কাছে পৌঁছে ঘটনা শোনালে তিনি ইরশাদ করলেন, ‘তোমরা ফিরে যাও, আমরা তাদের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার পূরণ করব আর তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করব।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৭৮৭)

২. হুদাইবিয়া সন্ধির সময় মুশরিকদের সঙ্গে এই চুক্তি হয়েছিল যে কুরাইশের কোনো ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে চলে এলে তাকে কুরাইশের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। হুদাইবিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনের পরপরই আবু বাসির উতবা ইবনে আসিদ মক্কার কারাগার থেকে পলায়ন করে মদিনায় চলে এলেন। মুশরিকরা দুই ব্যক্তিকে মদিনায় পাঠাল তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। রাসুল (সা.) আবু বাসির (রা.)-কে বললেন, ‘আবু বাসির! আমরা এই গোত্রের সঙ্গে যেসব অঙ্গিকার করেছি তা তুমি জান। আর আমাদের ধর্মে অঙ্গীকার ভঙ্গের অবকাশ নেই। আল্লাহ তাআলা তোমার ও তোমার মতো দুর্বলদের জন্য কোনো উপায় অবশ্যই বের করে দিবেন। তুমি তোমাদের গোত্রের কাছে ফিরে যাও।’ আবু বাসির আরজ করলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.)! আপনি আমাকে মুশরিকদের হাতে সোপর্দ করছেন? তারা তো আমাকে বিপদের সম্মুখীন করবে? আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন, ‘না, তুমি যাও। আল্লাহ তোমাদের জন্য কোনো উপায় বের করে দিবেন।’ মোটকথা, আবু বাসিরকে কুরাইশের লোকদের হাতে সোপর্দ করে দিলেন। (বুখারি, হাদিস : ২৭৩১)

৩. আবদুল্লাহ ইবনে আবিল হামসা (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.)-এর নবুয়ত লাভের আগের ঘটনা। আমি তাঁর কাছ থেকে একটা জিনিস কিনে কিছু দাম বাকি রেখে এই বলে চলে গেলাম যে আমি অবশিষ্ট মূল্য নিয়ে এখানে এসে পৌঁছিয়ে দেব। পরে আমি অঙ্গীকার ভুলে গেলাম। তিনদিন পর আমার এ ওয়াদার কথা মনে পড়লো। আমি অবশিষ্ট মূল্য নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখতে পেলাম, তিনি সেখানেই আছেন। তিনি বললেন, ওহে যুবক! তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছ। আমি তিনদিন যাবত এখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯৬)

অঙ্গীকার ভঙ্গ করা মুনাফেকির লক্ষণ

নবীজি (সা.) ওয়াদা ভঙ্গ করাকে মুনাফেকির লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করে ইরশাদ করেছেন। ‘চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে নির্ভেজাল মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফেকির একটি স্বভাব থেকে যায়। তা হলো আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে। কথা বললে মিথ্যা বলে। অঙ্গীকার করলে বিশ্বাসঘাতকতা করে। এবং ঝগড়ার সময় গালিগালাজ করে।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৪)

অঙ্গীকার ভঙ্গকারীর প্রতি লানত

ওয়াদা ভঙ্গকারীর প্রতি আল্লাহর লানত বর্ষিত হতে থাকে এবং তার অন্তর শক্ত করে দেওয়া হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘(আর বনি ইসরাইলের) ওয়াদা ভঙ্গের কারণে আমি তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছি এবং তাদের অন্তর শক্ত করে দিয়েছি।’ (সুরা মায়েদা : ১৩)

কিয়ামতের দিন অঙ্গীকার ভঙ্গকারীর পতাকা থাকবে

নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের সঙ্গে পতাকা থাকবে। তার বিশ্বাসঘাতকতার পরিমাণ অনুযায়ী তা উঁচু করা হবে। সাবধান! সাধারণ মানুষের নেতার চেয়ে (যদি সে বিশ্বাসঘাতকতা করে) বড় বিশ্বাসঘাতক আর কেউ নেই।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৭৩৮)

প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা অসম্ভব হলে করণীয়

যেকোনো ধর্মে ওয়াদা পালনের গুরুত্ব আছে। ইসলামে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। ওয়াদা রক্ষা করার সামর্থ্য থাকলে এবং তা পালন করতে ধর্মীয় কোনো বাধা না থাকলে যেকোনো মূল্যে তা রক্ষা করা ওয়াজিব। বিশেষ কোনো যৌক্তিক কারণে ওয়াদা রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়লে, যাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তাকে বিনয়ের সঙ্গে নিজের অপারগতা জানিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে।

লেখক: খতিব, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, ফার্মগেট, ঢাকা

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © jago barta
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com