রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০১:১২ অপরাহ্ন
Title :
পাইলটকে খুঁজে পেলেও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে মার্কিন সেনারা, উভয়পক্ষে সংঘর্ষ চলছে নববর্ষের শোভাযাত্রা এবার থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত হবে: সংস্কৃতিমন্ত্রী বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বাড়লেও বাংলাদেশে এখনো বৃদ্ধি পায়নি: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ক্ষমতায় গিয়ে তারা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে: গোলাম পরওয়ার ট্রাম্পের ‘নরক’ মন্তব্যের পাল্টা জবাব পুরো অঞ্চল মার্কিনিদের জন্য দোজখে পরিণত হবে: ইরান তেহরানের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তার হুঁশিয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের জন্য ‘বড় চমক’ অপেক্ষা করছে বিভাজনের চেষ্টা চালাচ্ছে একটি দল: মির্জা ফখরুল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানে স্থল অভিযানে নামবে ‘না’ ইসরায়েল! নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে প্যারিসে মুসলিমদের বার্ষিক সম্মেলন শুরু ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা, যে সতর্কবার্তা দিল রাশিয়া

রোমান সাম্রাজ্য থেকে আমেরিকা: নবুয়তের সংকেত ও বর্তমান ভূ-রাজনীতি

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬
  • ১৯ Time View
22
রোমান সাম্রাজ্য এবং বর্তমান আমেরিকার শক্তির তুলনা করুন। রোমানরা যেমন তাদের সময়ে অপরাজেয় পরাশক্তি ছিল, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আমেরিকা ঠিক সেই জায়গাটি দখল করে আছে। ইতিহাসের বড় বড় সাম্রাজ্যগুলো যখন তাদের ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছায়, তখন তারা অবদমন ও ঔদ্ধত্যের পথ বেছে নেয়। রোমানদের পতন এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা কি সেই একই ধ্বংসের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
যদিও রোমান সাম্রাজ্য একদিনে ধ্বংস হয়নি। ঐতিহাসিকদের মতে, এটি দীর্ঘ কয়েক শতক ধরে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়েছে। ২৮৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট ডায়োক্লেশিয়ান সাম্রাজ্যকে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য পূর্ব ও পশ্চিম—এই দুই ভাগে ভাগ করেন।
প্রতীকী পতন, ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিক উপজাতি নেতা ওডোয়াসার (Odoacer) পশ্চিম রোমের শেষ সম্রাট রোমুলাস অগাস্টাসকে (Romulus Augustulus) ক্ষমতাচ্যুত করেন। এই ঘটনাকেই প্রথাগতভাবে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের চূড়ান্ত সময় ধরা হয়।
রুমের পতনের মূল কারণগুলো ছিল উপজাতিদের আক্রমণ, অর্থনৈতিক সংকট ও  মুদ্রাস্ফীতি, সাম্রাজ্যের বিশাল আয়তন, সামরিক দুর্বলতা, জনস্বাস্থ্য ও নৈতিক অবক্ষয়,
ইতিহাস সাক্ষী পৃথিবীতে যত শক্তিশালী শাসক কিংবা সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল তার প্রথম সময়ের ব্যবধানে হয়েছে। আমেরিকা ও ইতিহাসের বাইরের কোন পাতা নয়। আমেরিকার একটি মহাদেশ তার উপর রয়েছে বিশ্বজুড়ে ৭৫০টিরও বেশি সামরিক ঘাঁটি বা স্থাপনা রয়েছে।  মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া ও জাপান: মার্কিন ঘাঁটির সংখ্যা জাপানে সবচেয়ে বেশি (প্রায় ১২০টি)। জার্মানি, দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জার্মানি (প্রায় ১১৯টি)। ​দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় ৭৩টি মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এই বিশাল সাম্রাজ্য অর্থনৈতিক সামাজিক বিভিন্ন কারণেই রুমদের মতোই আমেরিকার পতন সময়ের দাবি।
নবুয়তের সংকেত: রোম ও আখেরী জামানা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিভিন্ন হাদিসে আখেরী জামানায় ‘রুম’ বা রোমানদের (যাদের উত্তরাধিকারী বর্তমান পশ্চিমা সভ্যতা বা ইউরোপ-আমেরিকা বলে অনেক স্কলার মনে করেন) সাথে মুসলমানদের সংঘাত ও সন্ধির কথা বলা হয়েছে।
যেমন—আখেরী জামানায় রোমানদের সংখ্যাধিক্য এবং তাদের সামরিক আধিপত্যের খবর।
 ‘মালহামাতুল কুবরা’ বা মহাযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তির দাপট ও কৌশলের লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পারস্য (ইরান) এবং রোমের (পশ্চিমা শক্তি) মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্ব, যা ইসলামের প্রাথমিক যুগেও ছিল এবং আজও বিদ্যমান। ইতিহাসের পাতায় এই পরাশক্তি গুলো নিজেদের বয়ান তৈরি করে সমাজের শান্তি প্রতিষ্ঠার অজুহাতে প্রতিবেশী দেশগুলোর ও কাঠামো পরিবর্তন করে দেয়। তাদের এই বক্তব্য কুরআনে হুবহু মিলে যায়——সুরা বাকারার ১১ নম্বর আয়াত “আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করো না’, তখন তারা বলে, ‘আমরাই তো সংশোধনকারী (সংস্কারকারী)।’”
যোগ যোগ ধরে সাজানো সভ্য নগরীগুলো ধ্বংস করা হয়েছে একি বক্তব্য দিয়ে। রোমানরাও তাদের আগ্রাসনকে ‘Pax Romana’ বা রোমান শান্তি বলত, আজ আমেরিকা এক কথা বলছে ‘গণতন্ত্র রক্ষা’।
আমেরিকা তার মিত্র নেটো বাহিনীর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক শান্ত ও সচ্ছল দেশকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে এমন এক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যার পরিণতি আজ ভয়াবহভাবে দৃশ্যমান। যুদ্ধ, সামরিক হস্তক্ষেপ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে বহু দেশ তাদের স্থিতিশীলতা হারিয়েছে। এক সময়ের তুলনামূলক সমৃদ্ধ রাষ্ট্র লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া,  গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অজুহাতে গভীর সংকটে পতিত করেছে। এসব দেশের অসংখ্য স্বচ্ছল পরিবার আজ বাস্তুচ্যুত, নিঃস্ব ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
মধ্যপ্রচার সমৃদ্ধশালী দেশ সৌদি, কাতার, দুবাই কুয়েত, আমেরিকার আনুগত্যশীল হয়ে বিলাসের জীবন যাপন করছে। ইসলামী পোশাক পরে নারী বাড়িয়ার বিলাসী জীবন যাপন করে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আধিপত্য বাদীদের এই গোলাম বানিয়ে রেখেছে।
জাইনবাদী ইহুদীরা ১৯৪৭ সালে থেকে প্রকাশ্য
ফিলিস্তিনিদের বসতবাড়ি উচ্ছেদের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করে। ২০২৪ সালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের একটি ভাষণে গ্রেটার ইজরাইল একটি ম্যাপ প্রদর্শন করে। যাতে ফিলিস্তিনের কোন মানচিত্রই ছিল না। ইসরাইলের এই গ্রেটার ইজরাইল বাস্তবায়নের মূল বাধা একমাত্র ইরানকে মনে করছে। তাই বর্তমান ইরানের উপর আমেরিকা ইজরাইলের যৌথ ও অগণতান্ত্রিক গায়ের জোরে হামলা চালাচ্ছে।যদি ইরান পতন হয় তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের গ্রেটার ইজরাইল বানানোর প্রক্রিয়াকে প্রকার সাধ্য কারো থাকবে না।
আমেরিকা ইরানের উপর অত্যন্ত ব্যয়বহুল হামলা পরিচালনা করে তার মূল টার্গেট হচ্ছে পেট্রোলিয়াম সম্পদকে নিজের নিয়ন্ত্রনে নেওয়া। এটা বর্তমান যুগের একটি শিশু ভালো করে অনুধাবন করতে পারে। কেননা মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম পেট্রোল উৎপাদনের সূচনা হয় ইরানের মাধ্যমে।
এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের এই চুলগুলো মূলত কৃষিনির্ভর ছিল। ইরান (১৯০৮): ব্রিটিশ কোম্পানি ‘অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি’ (বর্তমানে বিপি বা ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম) প্রথম বড় ধরনের তেলক্ষেত্র আবিষ্কার করে। এটিই ছিল মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক তেল শিল্পের ভিত্তি।
ইরাক (১৯২৭): কিরকুক এলাকায় বিশাল তেলক্ষেত্র পাওয়ার পর ইরাকে বাণিজ্যিক উত্তোলন শুরু হয়।
সৌদি আরব (১৯৩৮): দাহরানের কাছে ‘দাম্মাম নং ৭’ কূপ থেকে তেল পাওয়ার মাধ্যমে সৌদি আরবে তেলের যুগ শুরু হয়। এটি সৌদি আরবের অর্থনীতির চিত্র সম্পূর্ণ বদলে দেয়। পেট্রোলিয়াম সমৃদ্ধে আজকে মধ্যপ্রাচ্যের পুরা বাজার আমেরিকান নিয়ন্ত্রণে থাকলে ও ইরানের
এই বিশাল পেট্রোলিয়াম তাদের আউট অফ কন্ট্রোল। এই পেট্রোলিয়াম রাশিয়া এবং চায়নার নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে এটা আমেরিকার পেস্টিজ ইসু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোমানরা যেমন তাদের উন্নত ইঞ্জিনিয়ারিং ও সামরিক ফর্মেশন দিয়ে বিশ্ব শাসন করত, আমেরিকা আজ তা করছে এআই (AI), স্যাটেলাইট এবং স্টিলথ প্রযুক্তি দিয়ে। আমেরিকা এবং ইরানের এই ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কেবল মানচিত্রের সীমানা নিয়ে নয়, এটি মূলত ক্ষমতার উৎস এবং নৈতিক মূল্যবোধের আধিপত্য নিয়ে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘সিস্টেমিক ফ্রিকশন’—যেখানে দুটি ভিন্ন ধারার বিশ্বব্যবস্থা এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে প্রচণ্ড উত্তাপ তৈরি করছে। এর সমাধানে কোনো গাণিতিক ফর্মুলা নেই, বরং প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি।
একটি নতুন সমীকরণ বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় Iran ও United States–এর সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন কৌশলগত সমীকরণ তৈরি করছে। এটি শুধু দুটি রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব নয়; বরং এর সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামরিক জোট এবং বৈশ্বিক রাজনীতির প্রভাব গভীরভাবে জড়িত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক জোট, অন্যদিকে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও কৌশলগত প্রতিরোধ—এই দুই শক্তির দ্বন্দ্ব মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে নতুন বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে সংঘাতটি সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে অনেক সময় প্রক্সি সংঘাত, সাইবার যুদ্ধ এবং কৌশলগত চাপের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান যেভাবে নিজের সার্বভৌমত্ব ও আদর্শিক অবস্থান রক্ষায় আমেরিকা ও ইসরায়েলের সম্মিলিত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক অসম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। এই মরণপণ যুদ্ধ কেবল ভূখণ্ডের লড়াই নয়, বরং এটি আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্ব রক্ষার এক সুকঠিন সংগ্রাম।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যের তথাকথিত প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্রগুলো যখন নিজেদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থ ও বৈষয়িক ভোগ-বিলাসের মোহে অন্ধ হয়ে পশ্চিমাদের সাথে তাবেদারি করছে, এমনকি আমেরিকা সামরিক গাটি স্থাপনা দিয়ে সহায়তা দিচ্ছে—তখন ইরানের একাকী মাথা উঁচু করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
যদি এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে, স্বজাতির নামধারী মুনাফিক রাষ্ট্রগুলোর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ইরান সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা পরাজিতও হয়, তবে সেই পরাজয়কে কোনোভাবেই ‘পরাজয়’ বলা চলে না। বরং ইতিহাসের পাতায় এটি ‘শহীদী বিজয়’ এবং ‘অনমনীয় আত্মসম্মানের মহত্তম জয়’ হিসেবেই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
কারণ, কাপুরুষোচিত আপসের চেয়ে আদর্শের লড়াইয়ে পতন অনেক বেশি গৌরবের। যারা জালিমের পায়ে মাথা নত করে বিলাসিতার জীবন বেছে নিয়েছে, বিজয় তাদের নয়; বরং বিজয় সেই লড়াকু সত্তার, যে একাকী হলেও সত্য ও ন্যায়ের ঝাণ্ডা উড্ডীন রাখতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। সময় সাক্ষ্য দেবে—বিলাসী মুনাফিকদের চেয়ে লড়াকু মজলুমের রক্তই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী।
মিসবাহ উদ্দিন আহমেদ 
নিউইয়র্ক।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © jago barta
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com