মোঃ মাইন উদ্দিন :
ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতার স্থান হিসেবে মাজারগুলো যুগ যুগ ধরে মানুষের কাছে নিরাপত্তা, শান্তি ও আশ্রয়ের প্রতীক হয়ে এসেছে। কিন্তু সেই পবিত্র স্থানই যখন সহিংসতা, মাদক ও জুয়ার আস্তানায় পরিণত হয় তখন তা শুধু উদ্বেগজনকই নয়, সমাজের নৈতিক অবক্ষয়েরও স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় হজরত শাহ সোলেমান লেংটার মাজারে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ১০৭তম লেংটার ওরস ও মেলার প্রথম দিনেই মাদক ও জুয়ার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষ, এবং এতে মাজারের প্রধান খাদেম মতিউর রহমান লাল মিয়ার গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা একটি গভীর সংকেত বহন করে।
প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আড়ালে মাদক ও জুয়ার মতো অবৈধ কর্মকাণ্ড এতটা বিস্তার লাভ করে? কারা এই অপতৎপরতার পৃষ্ঠপোষক? স্থানীয় প্রশাসন, আয়োজক কমিটি কিংবা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের ভূমিকা কতটা কার্যকর ছিল?
বাস্তবতা হলো, দেশের অনেক মাজার ও মেলাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অসুস্থ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে ধর্মীয় আবহের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু চক্র মাদক ব্যবসা, জুয়া ও চাঁদাবাজির মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের নিরাপত্তা যেমন হুমকির মুখে পড়ছে, তেমনি মাজারের পবিত্রতাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন একজন খাদেম যিনি মূলত সেই মাজারের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। অর্থাৎ, অপরাধীরা এখন আর কাউকেই ছাড় দিচ্ছে না। এটি আইন-শৃঙ্খলার জন্য যেমন একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি সমাজের জন্যও একটি সতর্কবার্তা।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে, এটি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে শুধু ঘটনার পর নিয়ন্ত্রণে আনা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ঘটনার পূর্বেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। বিশেষ করে বড় ধরনের ওরস ও মেলাগুলোতে কঠোর নজরদারি, সিসিটিভি স্থাপন, নিয়মিত টহল এবং মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
একইসঙ্গে স্থানীয় জনগণ ও ধর্মীয় নেতাদেরও সচেতন হতে হবে। মাজারকে ঘিরে যেন কোনো অসামাজিক কার্যকলাপ না ঘটে, সে বিষয়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। কারণ, শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, এখানে প্রয়োজন সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ।
শেষ কথা হলো, মাজার শুধু একটি স্থান নয়, এটি বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। সেই জায়গাকে যদি আমরা নিরাপদ রাখতে না পারি, তবে সমাজের অন্যান্য স্তরেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সোলেমান লেংটার মাজারের এই ঘটনা তাই কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার মতো একটি সতর্ক সংকেত। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে, যার দায় এড়ানোর সুযোগ কারোই থাকবে না।