মোঃ মাইন উদ্দিন
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত একটা। হঠাৎ বেজে উঠলো ফোন। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো আতঙ্কে ভরা কণ্ঠ- বাঁচার আকুতি, ক্ষমা প্রার্থনা, আর অনিশ্চয়তার ভারী নিশ্বাস। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বললেন, “আমি আপনাকে চিনি।” কিছুক্ষণ পর নিজের পরিচয় স্পষ্ট করলেন।
তিনি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের নলবাইদ গ্রামের আলতাফ হোসেনের ছেলে- দুবাই প্রবাসী মোঃ সুমন মিয়া।
সুমন মিয়া জানান, অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে পাঁচ বছর আগে তিনি পাড়ি জমান সংযুক্ত আরব আমিরাতে। দুবাইয়ের আজমান শহরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে আসছিলেন। দেশে রেখে যাওয়া মা-বাবা, স্ত্রী ও একমাত্র কন্যা সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতেই ছিল তাঁর প্রবাসজীবনের সংগ্রাম।
কিন্তু হঠাৎ করে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া উত্তেজনা তাঁদের জীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। আঞ্চলিক সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলার প্রভাবে বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠে। সুমন মিয়ার ভাষ্য, “ভাই, যদি বেঁচে থাকি, দেখা হবে। আপনার সাথে কথা বলার সময়ও কানে বিস্ফোরণের শব্দ আসছে।” তাঁর কণ্ঠে ছিল আতঙ্ক আর অজানা ভবিষ্যতের শঙ্কা।
তিনি আরও জানান, তাঁর পাশে তখন বাজিতপুর পৌর শহরের আরেক প্রবাসী যুবক সঞ্জিতও ছিলেন, যিনি একই প্রতিষ্ঠানে ফোরম্যান হিসেবে কর্মরত। দু’জনেই নিরাপদে থাকার চেষ্টা করছেন, তবে পরিস্থিতি নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না। “আমরা দেশবাসীর দোয়া চাই”- ফোনের শেষ প্রান্তে এই আবেদনই ছিল তাঁদের।
মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত অর্ধ কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির মতো সুমন মিয়াও পরিবারের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব তাঁদের জীবন-জীবিকাকে কতটা ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে, এই ঘটনা তারই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাই যেকোনো অস্থির পরিস্থিতিতে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ ও সার্বিক সহযোগিতাই পারে প্রবাসীদের উদ্বেগ কিছুটা হলেও লাঘব করতে।
মধ্যরাতের সেই ফোনকল যেন মনে করিয়ে দেয়- দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও প্রবাসীদের হৃদস্পন্দন জড়িয়ে থাকে জন্মভূমির সাথে। তাঁদের নিরাপত্তা আর সুস্থতা শুধু তাঁদের পরিবারের নয়, পুরো জাতিরই প্রত্যাশা।