মোঃ মাইন উদ্দিন :
কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবের মাটি, মানুষের জীবনযাপন ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড (মিল্ক ভিটা) শুনলাম ভৈরব উপজেলা পরিষদ এলাকা থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছে। যদি তা-ই হয়, তবে এই বিদায় শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের স্থানান্তর নয়, এটি যেন একটি সময়ের অবসান, একটি স্মৃতির মলিন হয়ে যাওয়া।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গরুর দুধ উৎপাদন ও বিপণনে যুগান্তকারী অবদান রাখা বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড (মিল্ক ভিটা) দীর্ঘদিন ধরে ভৈরবের কৃষক ও খামারিদের নির্ভরতার প্রতীক ছিল। এখানকার অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের উৎপাদিত দুধের ন্যায্য মূল্য পেয়েছেন, জীবিকার স্থিতিশীলতা অর্জন করেছেন এবং নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়েছেন।
ভৈরব উপজেলা পরিষদ চত্বরে মিল্ক ভিটার উপস্থিতি শুধু একটি অফিস বা সংগ্রহ কেন্দ্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল একটি আস্থার জায়গা, যেখানে কৃষকরা প্রতিদিন তাদের পরিশ্রমের ফসল তুলে দিতেন নিশ্চিন্ত মনে। গ্রামের সহজ-সরল খামারিরা জানতেন- তাদের দুধ নষ্ট হবে না, প্রতারিত হবেন না, বরং সঠিক মূল্যই পাবেন।
তাছাড়াও এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান-এর স্মৃতি। তাঁর সময়কার উদ্যোগ ও প্রেরণায় ভৈরবে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার যে প্রচেষ্টা গড়ে উঠেছিল, মিল্ক ভিটা ছিল তারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই এই প্রতিষ্ঠানটির বিদায় মানে শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, এটি এক ধরনের আবেগঘন বিচ্ছেদও বটে।
বর্তমান সময়ে যখন কৃষি ও খামারভিত্তিক অর্থনীতিকে আরও আধুনিক ও টেকসই করার কথা বলা হচ্ছে, তখন এমন একটি প্রতিষ্ঠানের স্থানান্তর অনেকের মনে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। কৃষকরা কি আগের মতোই সহজে তাদের উৎপাদিত দুধ বাজারজাত করতে পারবেন? তাদের যাতায়াত খরচ কি বাড়বে না? নতুন ব্যবস্থায় তারা কতটা সুবিধা পাবেন এসব প্রশ্ন এখন ভৈরবের গ্রামাঞ্চলে ঘুরপাক খাচ্ছে।
অনেক খামারির মতে, মিল্ক ভিটার এই অবস্থান পরিবর্তনের ফলে তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে। আগে যেখানে সহজেই দুধ সরবরাহ করা যেত, এখন হয়তো দূরত্ব বেড়ে যাওয়ার কারণে সময় ও খরচ- দুটোই বাড়বে। এর প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে তাদের আয় ও উৎপাদন উৎসাহের ওপর।
অন্যদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি এই স্থানান্তরের পেছনে উন্নয়নমূলক কোনো পরিকল্পনা থেকে থাকে, তবে সেটি স্বচ্ছভাবে কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের সামনে তুলে ধরা জরুরি। কারণ, একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা শুধু তার কাঠামো বা অবস্থানের ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে মানুষের আস্থা, অংশগ্রহণ এবং সুবিধাভোগীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর।
ভৈরবের মানুষের কাছে মিল্ক ভিটা শুধুই একটি প্রতিষ্ঠান নয়- এটি একটি সম্পর্ক, একটি নির্ভরতা, একটি স্মৃতি। সেই স্মৃতি বহন করে চলেছে কৃষকের ঘাম, পরিশ্রম আর আশা-আকাঙ্ক্ষা। তাই এই বিদায়ের মুহূর্তে প্রয়োজন যথাযথ পরিকল্পনা, বিকল্প ব্যবস্থা এবং সবচেয়ে বড় কথা, কৃষকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
পরিশেষে বলবো, সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছুই বদলায়, প্রতিষ্ঠানও স্থানান্তরিত হয়। তবে পরিবর্তনের এই পথে যেন মানুষের কষ্ট না বাড়ে, বরং উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছায় এই প্রত্যাশাই ভৈরববাসীর।