রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৫ পূর্বাহ্ন

ফাল্গুনে ঝরা ঝুলন্ত শিমুল ফুল দেখলেই মনে পড়ে ফেলানীর কথা

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬
  • ৭৪ Time View
86

মোঃ মাইন উদ্দিন

ফাল্গুন এলে প্রকৃতি রাঙিয়ে ওঠে লাল শিমুলে। গাছের ডালে ডালে ফুটে থাকা ফুল হঠাৎ ঝরে পড়ে মাটিতে- রক্তিম, নীরব, নিথর। সেই ঝরা শিমুল ফুলের দিকে তাকালেই মনে পড়ে যায় এক কিশোরীর কথা; যার নিথর দেহও একদিন সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলেছিল- নির্মম, অমানবিক এক স্মৃতিচিহ্ন হয়ে।

বলছি- ফেলানী খাতুনের কথা। আজকের এ দিনে ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ভোরে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান ১৪ বছর বয়সী কিশোরী ফেলানী। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাঁর মরদেহ কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে ছিল প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ ঘণ্টা পর তাঁর মরদেহ বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সেই ঝুলন্ত মরদেহের ছবি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। ক্ষোভ, বেদনা আর প্রতিবাদের ঝড় ওঠে সর্বত্র। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সুষ্ঠু বিচারের দাবি তোলে। প্রশ্ন ওঠে- সীমান্তে কি মানবাধিকার থেমে যায়? একটি কিশোরীর প্রাণ কি এতটাই তুচ্ছ?

পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালের ১৩ জুলাই ভারতীয় মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) ফেলানী হত্যার বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন করে। ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর শুনানির পর মামলার পরবর্তী তারিখ বারবার পিছিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার চূড়ান্ত অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য জনসমক্ষে আসেনি। বিচারপ্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগী পরিবার ও সচেতন মহলে হতাশার জন্ম দেয়।

ফেলানীকে যখন হত্যা করা হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৪। আজ বেঁচে থাকলে বয়স হতো ২৯। হয়তো তাঁরও থাকত স্বপ্নে সাজানো একটি সংসার, নিজের মতো করে বাঁচার গল্প। কিন্তু একটি গুলি থামিয়ে দিয়েছে সেই সম্ভাবনার সব দরজা।
ফাল্গুনের লাল শিমুল তাই কেবল ঋতুর রূপ নয়- এটি হয়ে উঠেছে এক প্রতীক। সীমান্তে প্রাণ হারানো নিরীহ মানুষের প্রতীক, বিচারহীনতার প্রতীক এবং মানবাধিকারের প্রশ্নের প্রতীক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ঘটনা ধুলোমলিন হয়ে যায়, কিন্তু কিছু ছবি ইতিহাসে স্থায়ী দাগ কেটে যায়। ফেলানীর ঝুলন্ত দেহের সেই ছবি তেমনই এক স্মারক- যা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, প্রশ্ন করতে শেখায়।

সীমান্তরক্ষার নামে অমানবিকতা কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও মানবিকতা ও আইনের শাসন অটুট থাকতে হবে। ফেলানীর স্মৃতি আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়- বিচারহীনতা যেন আর কোনো কিশোরীর ভবিষ্যৎ গ্রাস না করে।
ফাল্গুন এলে শিমুল আবার ফুটবে, আবার ঝরবে। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা- মানবতার পক্ষে উচ্চারিত কণ্ঠ যেন আর ঝরে না পড়ে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © jago barta
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com