রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৩ পূর্বাহ্ন

নর্থ সাইপ্রাসে বাংলাদেশি শ্রমিকদের দুর্দশা: ন্যায়বিচার কোথায়?

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬
  • ১৬৩ Time View
204

মোঃ মাইন উদ্দিন :

আমি একজন সাইপ্রাস প্রবাসী সন্তানের বাবা হিসেবে বিবেকের তাড়নায় লিখছি। বিদেশে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন অনেক বাংলাদেশির কাছে কেবল জীবিকার নয়, পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার এক কঠিন প্রতিজ্ঞা। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ অনেক সময় হয়ে ওঠে শোষণ, প্রতারণা ও অবিচারের অন্ধকার গলিপথ। তুর্কি অধ্যুষিত নর্থ সাইপ্রাসে চুরির অভিযোগে ছয় বাংলাদেশি রেস্তোরাঁকর্মীকে জেলে পাঠানোর সাম্প্রতিক ঘটনা আবারও সেই নির্মম বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।
চুরির অভিযোগে কারাবন্দি হওয়া ছয় বাংলাদেশি হলেন- শাহাদাৎ হোসেন, রাজু আহমেদ, আরিফুর রহমান, মোঃ শাউন মিয়া, শাউন হোসেন ও শিহাবুর রহমান। তারা নর্থ সাইপ্রাসের গিরনা শহরের ‘হাংগ্রি হাউজ’ নামের একটি রেস্তোরাঁয় প্রায় দুই বছর ধরে কাজ করে আসছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, রেস্তোরাঁর মালিক তাদের ওপর চুরির দায় চাপিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন।
তবে সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির দাবি ভিন্ন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো চুরির ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের বেতন বকেয়া ও শ্রমিক নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় কর্মীদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার কৌশল।
জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় একসঙ্গে ২২ জন বাংলাদেশি ওই রেস্তোরাঁয় কাজ করতে নর্থ সাইপ্রাসে যান। শুরু থেকেই তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। চুক্তি অনুযায়ী মাসিক বেতন হওয়ার কথা ছিল প্রায় ৪০ হাজার লিরা। কিন্তু বাস্তবে তাদের দেওয়া হয়েছে মাত্র ২০ হাজার লিরা, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫৫ হাজার টাকার সমান। তাও আবার নিয়মিত নয়- অনেক সময় মাসের পর মাস কোনো বেতনই পাননি তারা।
ভুক্তভোগী কর্মীদের অভিযোগ, প্রথম মাস থেকেই বেতন দেওয়ার কথা থাকলেও সাত মাস পর্যন্ত কোনো পারিশ্রমিক পাননি তারা। এমনকি দুই বছর পার হয়ে গেলেও প্রত্যেকের ছয় মাসের বেশি বেতন এখনো বকেয়া রয়েছে।
বেতনের দাবিতে চাপ সৃষ্টি করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। অভিযোগ রয়েছে, মালিকপক্ষ কর্মীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায়। এক পর্যায়ে পুলিশকে জানানো হলে মালিককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। কিন্তু পাঁচদিন কারাভোগের পর ছাড়া পেয়ে তিনি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন।
এরপরই সামনে আসে চুরির অভিযোগ। কর্মীদের দাবি, রেস্তোরাঁটির ম্যানেজার ছয় মাস আগে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। অথচ সেই ঘটনার দায় ছয় মাস পর বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর চাপানো হয়।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো- কর্মীদের পাসপোর্টও মালিকপক্ষ জব্দ করে রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে তারা অন্য কোথাও কাজ করার সুযোগও পাচ্ছেন না। দালালের মাধ্যমে বিদেশে গেলেও সেই দালালও শেষ পর্যন্ত মালিকের পক্ষ নিয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এই ঘটনা কেবল ছয়জন শ্রমিকের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যের গল্প নয়; বরং এটি বিদেশে থাকা বহু বাংলাদেশি শ্রমিকের নীরব আর্তনাদের প্রতিচ্ছবি।
নর্থ সাইপ্রাসে কর্মরত বাংলাদেশিদের মতে, সেখানে শক্তিশালী কোনো বাংলাদেশি কমিউনিটি নেই, নেই বাংলাদেশের কোনো দূতাবাসও। ফলে অন্যায়ের শিকার হলেও তারা কার্যত অসহায়। অভিযোগ জানানোর মতো নির্ভরযোগ্য কোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামো তাদের সামনে নেই।
প্রশ্ন হলো- যে মানুষগুলো পরিবারকে বাঁচাতে, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে বিদেশে পাড়ি জমায়, তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার দায়িত্ব কার?
প্রবাসী শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। অথচ বাস্তবতা হলো- অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশের মাটিতে তারা হয়ে ওঠেন সবচেয়ে অবহেলিত মানুষ।
এ পরিস্থিতি বদলাতে হলে সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর আগে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান, চুক্তি ও কর্মপরিবেশ সম্পর্কে কঠোর যাচাই-বাছাই জরুরি। একই সঙ্গে যেসব দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন, সেখানে কূটনৈতিক তৎপরতা ও সহায়তা জোরদার করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
নর্থ সাইপ্রাসের ঘটনাটি তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আমাদের অভিবাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
বিদেশের মাটিতে কাজ করতে যাওয়া মানুষগুলো অপরাধী নয়- তারা স্বপ্নবাহী শ্রমিক। সেই স্বপ্ন যেন অন্যায়ের বোঝায় ভেঙে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ- উভয়েরই দায়িত্ব।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © jago barta
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com