মোঃ মাইন উদ্দিন :
সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় সাংবাদিকের সাথে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা প্রশাসনিক আচরণ নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে। অভিযোগ উঠেছে, নিকলী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রতীক দত্তের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিক আলী জামসেদ ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন।
স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি, এসিল্যান্ড প্রতীক দত্তের বিরুদ্ধে প্রকাশিত একটি দুর্নীতিবিষয়ক প্রতিবেদন তাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। সেই ক্ষোভেই পরিকল্পিতভাবে সাংবাদিককে হয়রানি করা হয়েছে।
তাদের ভাষ্য, গত ১২ মার্চ দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে সাংবাদিক আলী জামসেদ নিকলী বাজার এলাকার একটি দোকানে বসে ছিলেন। এ সময় রাস্তার পাশে পার্ক করা একটি লাইসেন্সবিহীন মোটরসাইকেল চালানোর অভিযোগ তুলে তাকে আটক করা হয়। তখন সাংবাদিক বারবার দাবি করেন, মোটরসাইকেলটি তার নয়। কিন্তু তার বক্তব্য আমলে না নিয়ে তাকে আটক করে রাখা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ অনুযায়ী, দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রায় চার ঘণ্টা তাকে আটকে রেখে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়। স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা লিখেছেন, মোটরসাইকেলটির মালিকানা স্বীকার করানোর জন্য তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং নানা ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।
অবশেষে বিকেল ৫টার দিকে ‘অশোভন আচরণ’ এর অভিযোগ এনে তাকে নিকলী থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠায়।
মামলার নথিপত্র ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আদালত সাংবাদিক আলী জামসেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো সত্যতা খুঁজে না পাওয়ায় তাকে মুক্তির নির্দেশ দেন। আদালতের এই সিদ্ধান্ত ঘটনাটিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে এবং প্রশ্ন তোলে, একজন সাংবাদিককে কি তাহলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানি করা হয়েছিল?
বাস্তব অর্থে একজন সাংবাদিক কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি সমাজের চোখ ও কণ্ঠস্বর। অন্যায়, দুর্নীতি ও অনিয়ম তুলে ধরাই তার দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনের কারণে যদি কোনো সাংবাদিক প্রশাসনিক প্রতিহিংসার শিকার হন, তবে তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।
নিকলীর এই ঘটনায় স্থানীয় সচেতন সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তারা মনে করছেন, প্রশাসনের দায়িত্বশীল পদে থাকা কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে সত্য উদঘাটনের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
কারণ রাষ্ট্রের প্রশাসন ও গণমাধ্যম, দুটি শক্তিই সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটির কাজ আইন-শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অন্যটির কাজ সত্য তুলে ধরা। এই দুই শক্তির মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জবাবদিহিতা বজায় থাকলেই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে ওঠা সম্ভব।
নিকলীর ঘটনাটি তাই কেবল একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত ভোগান্তির গল্প নয়, এটি আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতি, ক্ষমতার ব্যবহার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বড় একটি প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। এখন দেখার বিষয়, এই প্রশ্নের জবাব কীভাবে দেওয়া হয়।